২০১৮ সালের মার্চ মাসে দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে অনুষ্ঠিত ৪ ম্যাচের টেস্ট সিরিজটি কেবল একটি সিরিজ ছিল না, এটি ছিল অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেট ঐতিহ্যের এক চরম পরীক্ষা। ২০১৬ সালে টেস্ট র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষে থাকা অস্ট্রেলিয়া ২০১৭ সালে ভারত ও বাংলাদেশের কাছে হেরে ৫ নম্বর অবস্থানে নেমে যায়। এই পরিস্থিতিতে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার তৎকালীন চেয়ারম্যান জেমস সাডাল্যান্ড খেলোয়াড়দের কড়া বার্তা দেন যে, তাদের কেবল খেলার জন্য নয়, জেতার জন্য অর্থ দেওয়া হয়। এই ‘যেকোনো মূল্যে জয়’ (Win at all cost) মানসিকতাই সিরিজটিকে ইতিহাসের অন্যতম কলঙ্কিত অধ্যায়ে পরিণত করে।
১ম টেস্ট: কিংসমিড, ডারবান (১–৫ মার্চ, ২০১৮)
- দিন ১: অস্ট্রেলিয়া টসে জিতে ব্যাটিং করার সিদ্ধান্ত নেয়। শুরুতেই ডেভিড ওয়ার্নার ও স্টিভ স্মিথ ধীরস্থিরভাবে ইনিংস এগিয়ে নিয়ে যান। দিন শেষে অস্ট্রেলিয়ার সংগ্রহ দাঁড়ায় ২২৫/৫। দক্ষিণ আফ্রিকার বোলাররা শেষ বিকেলে কয়েকটি উইকেট নিয়ে ম্যাচে ফেরার চেষ্টা করেন।
- দিন ২: মিচেল মার্শের দুর্দান্ত ৯৬ রানের ওপর ভর করে অস্ট্রেলিয়া প্রথম ইনিংসে ৩৫১ রান সংগ্রহ করে। জবাবে দক্ষিণ আফ্রিকা ব্যাটিং বিপর্যয়ে পড়ে এবং মিচেল স্টার্কের রিভার্স সুইংয়ের সামনে মাত্র ১৬২ রানে গুটিয়ে যায়। স্টার্ক একাই ৫ উইকেট নিয়ে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ অস্ট্রেলিয়ার হাতে এনে দেন। এই ইনিংসেই নেথান লায়ন এবি ডি ভিলিয়ার্সকে রান আউট করার পর তার ওপর বল ফেলে দিয়ে এক বিতর্কিত উদযাপন করেন।
- দিন ৩ (৪ মার্চ – ওয়ার্নার বনাম ডি কক ঝগড়া): অস্ট্রেলিয়ার দ্বিতীয় ইনিংস চলাকালীন মাঠের পরিস্থিতি অত্যন্ত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। চা-বিরতির সময় ড্রেসিংরুমে যাওয়ার পথে সিঁড়িতে ডেভিড ওয়ার্নার এবং কুইন্টন ডি ককের মধ্যে তীব্র বাদানুবাদ শুরু হয়। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায় ডি কক শান্ত থাকলেও ওয়ার্নার আক্রমণাত্মকভাবে তার দিকে তেড়ে যাচ্ছেন। ওয়ার্নার পরে অভিযোগ করেন যে ডি কক তার স্ত্রীকে নিয়ে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করেছিলেন। উত্তেজনা এতটাই ছিল যে আম্পায়ারদের স্টাম্প মাইক পর্যন্ত বন্ধ করে দিতে হয়েছিল।
- দিন ৪: জয়ের জন্য ৪১৭ রানের পাহাড়সম লক্ষ্য তাড়া করতে নামে দক্ষিণ আফ্রিকা। এইডেন মার্করাম এক প্রান্ত আগলে রেখে ১৪৩ রানের একটি বীরত্বপূর্ণ ইনিংস খেলেন এবং তাকে সঙ্গ দেন কুইন্টন ডি কক। দিন শেষে দক্ষিণ আফ্রিকা ২৯৩/৯ রান তুলে লড়াই চালিয়ে যায়।
- দিন ৫: দক্ষিণ আফ্রিকা ২৯৮ রানে অলআউট হলে অস্ট্রেলিয়া ১১৮ রানে জয়ী হয়।
২য় টেস্ট: সেন্ট জর্জেস পার্ক, পোর্ট এলিজাবেথ (৯–১২ মার্চ, ২০১৮)
- দিন ১: কাগিসো রাবাদার ৫ উইকেট শিকারের মুখে অস্ট্রেলিয়া প্রথম ইনিংসে মাত্র ২৪৩ রানে অলআউট হয়। দিন শেষে দক্ষিণ আফ্রিকা ১ উইকেটে ৩৯ রান সংগ্রহ করে।
- দিন ২: দক্ষিণ আফ্রিকার অভিজ্ঞ ব্যাটার হাশিম আমলা এবং এবি ডি ভিলিয়ার্স অস্ট্রেলিয়ান বোলারদের শাসন করতে শুরু করেন। দক্ষিণ আফ্রিকার স্কোর দাঁড়ায় ২৬৩/৭ এবং তারা ২০ রানের লিড পায়।
- দিন ৩ (ডি ভিলিয়ার্সের মহাকাব্যিক ইনিংস): এবি ডি ভিলিয়ার্স অস্ট্রেলিয়ার বিশ্বমানের বোলিং আক্রমণের সামনে মাত্র ১৪৬ বলে ১২৬ রানের এক অনবদ্য অপরাজিত সেঞ্চুরি করেন। তার এই ইনিংসে ছিল ২০টি চার এবং ১টি ছক্কা, যেখানে তার স্ট্রাইক রেট ছিল ৮৬.৩০। তার এই বিধ্বংসী ইনিংসের সুবাদে দক্ষিণ আফ্রিকা ৩৮২ রান তুলে ১১৯ রানের বিশাল লিড পায়। এই দিন রাবাদা ও স্মিথের কাঁধে ধাক্কা লাগার ঘটনায় রাবাদাকে প্রথমে দুই ম্যাচের জন্য ব্যান করা হলেও পরে তা তুলে নেওয়া হয়।
- দিন ৪: কাগিসো রাবাদার দাপটে অস্ট্রেলিয়া ১৭৫ রানে অলআউট হয়। দক্ষিণ আফ্রিকা ৬ উইকেটে জয়ী হয়ে সিরিজে ১-১ সমতা ফেরায়।
৩য় টেস্ট: নিউল্যান্ডস, কেপ টাউন (২২–২৫ মার্চ, ২০১৮) — ‘স্যান্ডপেপারগেট’
- দিন ১: ডিন এলগারের ১৪১ রানের অপরাজিত ইনিংসে দক্ষিণ আফ্রিকা প্রথম দিন শেষে ৮ উইকেটে ২৬৬ রান তুলতে সক্ষম হয়।
- দিন ২: দক্ষিণ আফ্রিকা ৩১১ রানে অলআউট হয়। জবাবে অস্ট্রেলিয়া ২৫৫ রান সংগ্রহ করে। দক্ষিণ আফ্রিকা দ্বিতীয় ইনিংসে বিনা উইকেটে ৫২ রানে দিন শেষ করে।
- দিন ৩ (২৪ মার্চ, ২০১৮ — বল ট্যাম্পারিংয়ের দিন): দুপুর ৩:১৫ মিনিটের দিকে ক্যামেরন ব্যানক্রফটকে পকেট থেকে একটি হলুদ শিরিষ কাগজ (Sandpaper) বের করে বল ঘষতে দেখা যায়। ধরা পড়ে যাওয়ার ভয়ে তিনি কাগজটি দ্রুত তার অন্তর্বাসের (Underwear) ভেতর লুকিয়ে ফেলেন। মাঠে ৩০টির বেশি ক্যামেরা এবং অত্যন্ত শক্তিশালী জুম লেন্স থাকায় এই দৃশ্য স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে। যদিও আম্পায়ারদের কাছে তিনি সানগ্লাস মোছার কালো কাপড় দেখিয়ে পার পাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন।
- দিন ৪: মানসিকভাবে ভেঙে পড়া অস্ট্রেলিয়া মাত্র ১০৭ রানে অলআউট হয়। দক্ষিণ আফ্রিকা ৩২২ রানে জয়ী হয়।
- ম্যাচের শেষ ও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত: এই কেলেঙ্কারির পর অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়াকে ফোন করে খেলোয়াড়দের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে বলেন। এর ফলে অধিনায়ক স্টিভ স্মিথ, সহ-অধিনায়ক ডেভিড ওয়ার্নার এবং ক্যামেরন ব্যানক্রফটকে তাৎক্ষণিকভাবে দল থেকে বহিষ্কার করে অস্ট্রেলিয়ায় ফেরত পাঠানো হয়।
৪র্থ টেস্ট: ওয়ান্ডারার্স, জোহানেসবার্গ (৩০ মার্চ – ৩ এপ্রিল, ২০১৮)
- দিন ১: টিম পেইনের নেতৃত্বে নতুনভাবে মাঠে নামে অস্ট্রেলিয়া। দক্ষিণ আফ্রিকার এইডেন মার্করাম ১৫২ রানের বিধ্বংসী ইনিংস খেলেন।
- দিন ২: দক্ষিণ আফ্রিকা প্রথম ইনিংসে ৪৮৮ রানের বিশাল সংগ্রহ দাঁড় করায়। জবাবে অস্ট্রেলিয়া ১১০ রান তুলতেই ৬ উইকেট হারিয়ে দিন শেষ করে।
- দিন ৩ ও ৪: দক্ষিণ আফ্রিকা তাদের দ্বিতীয় ইনিংসে ৩৪৪/৬ রান তুলে ইনিংস ঘোষণা করে। জয়ের জন্য অস্ট্রেলিয়ার সামনে লক্ষ্য দাঁড়ায় ৬১২ রান। দিন শেষে তারা ৩ উইকেটে ৮৮ রান করে।
- দিন ৫: ভারনন ফিল্যান্ডারের ২১ রানে ৬ উইকেট শিকারের মুখে অস্ট্রেলিয়া মাত্র ১১৯ রানে অলআউট হয় এবং দক্ষিণ আফ্রিকা ৪৯২ রানে জয়ী হয়। এর ফলে দক্ষিণ আফ্রিকা ৩-১ ব্যবধানে সিরিজটি জিতে নেয়।
শাস্তি ও নিষেধাজ্ঞার তালিকা
১. ডেভিড ওয়ার্নার: বল ট্যাম্পারিংয়ের মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে ১ বছরের নিষেধাজ্ঞা এবং আজীবনের জন্য অধিনায়কত্বের ওপর নিষেধাজ্ঞা। ২. স্টিভ স্মিথ: ১ বছরের নিষেধাজ্ঞা এবং পরবর্তী ১ বছর নেতৃত্বের ওপর নিষেধাজ্ঞা। ৩. ক্যামেরন ব্যানক্রফট: ৯ মাসের নিষেধাজ্ঞা। আইপিএল এবং ঘরোয়া ক্রিকেট থেকেও তাদের ১ বছরের জন্য নিষিদ্ধ করা হয়েছিল।
উপসংহার
২০১৮ সালের এই সিরিজটি কেবল দক্ষিণ আফ্রিকার জয়ের ইতিহাস নয়, এটি ছিল ক্রিকেটের শুদ্ধি অভিযানের এক উদাহরণ। ‘স্যান্ডপেপারগেট’ অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটকে এক বড় শিক্ষা দিয়ে যায় যে, জয়ের চেয়ে খেলার মর্যাদা রক্ষা করা বেশি জরুরি। নিষিদ্ধ হওয়ার পর স্মিথ ও ওয়ার্নারের কান্নাভেজা সংবাদ সম্মেলন ভক্তদের হৃদয় স্পর্শ করলেও এটি একটি কঠোর ও যুগান্তকারী দৃষ্টান্ত হিসেবে ক্রিকেটের ইতিহাসে অক্ষয় হয়ে আছে।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
২০১৮ সালের দক্ষিণ আফ্রিকা বনাম অস্ট্রেলিয়া টেস্ট সিরিজটি কেন এত বিতর্কিত হয়ে ওঠে?
এই সিরিজটি বিতর্কিত হয়ে ওঠে মূলত তৃতীয় টেস্টে সংঘটিত ‘স্যান্ডপেপারগেট’ বল ট্যাম্পারিং কেলেঙ্কারির কারণে। ক্যামেরন ব্যানক্রফটকে বল ঘষতে স্যান্ডপেপার ব্যবহার করতে দেখা যায়, যা ক্রিকেটের নৈতিকতা ও নিয়মের চরম লঙ্ঘন হিসেবে ধরা হয়।
স্যান্ডপেপারগেটে কারা দোষী ছিলেন?
অধিনায়ক স্টিভ স্মিথ, সহ-অধিনায়ক ডেভিড ওয়ার্নার ও ক্যামেরন ব্যানক্রফট।
বল ট্যাম্পারিংয়ের ঘটনায় খেলোয়াড়দের কী শাস্তি দেওয়া হয়েছিল?
স্টিভ স্মিথকে ১ বছরের জন্য আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে নিষিদ্ধ করা হয়।
ডেভিড ওয়ার্নারকে ১ বছরের নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি আজীবনের জন্য অধিনায়কত্ব থেকে নিষিদ্ধ করা হয়।
ক্যামেরন ব্যানক্রফটকে ৯ মাসের জন্য আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে নিষিদ্ধ করা হয়।
২০১৮ সালের এই টেস্ট সিরিজের ফলাফল কী ছিল?
চার ম্যাচের এই টেস্ট সিরিজে দক্ষিণ আফ্রিকা ৩–১ ব্যবধানে অস্ট্রেলিয়াকে পরাজিত করে সিরিজ জয় করে। শেষ দুটি টেস্টে দক্ষিণ আফ্রিকার আধিপত্য ছিল সম্পূর্ণ একতরফা।
এই সিরিজটি ক্রিকেট ইতিহাসে কেন এত গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়?
এই সিরিজটি ক্রিকেট ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ কারণ এটি দেখিয়েছে যে ক্রিকেটের নৈতিকতা ও সততা রক্ষার ক্ষেত্রে কোনো তারকা খেলোয়াড়ই আইনের ঊর্ধ্বে নয়। ‘স্যান্ডপেপারগেট’ ঘটনার পর নেওয়া কঠোর সিদ্ধান্তগুলো ক্রিকেট বিশ্বে একটি শক্ত বার্তা দেয় এবং ভবিষ্যতের জন্য নজির স্থাপন করে।
Your comment will appear immediately after submission.