রমজান মাসে সেহরি ও ইফতার নিয়মিত পালন কেন গুরুত্বপূর্ণ

✅ Expert-Approved Content
Rate this

রমজানের পবিত্র মাস এলেই অনেকের মনে এক গুচ্ছ প্রশ্ন ঘুরপাক খায়: “সকালে এত ভোরে উঠে সেহরি খাওয়া কি সত্যিই জরুরি?” অথবা “ইফতারে একবারে পেট ভরে খেয়ে নিলেই কি কাজ চলে যাবে?” এই প্রশ্নগুলোর উত্তর শুধু ধর্মের পাতায় সীমাবদ্ধ নেই, বরং বিস্তৃত হয়ে আছে আমাদের শরীরের গভীরে, আমাদের দিনযাপনের কর্মক্ষমতায়।

রমজান মাসে সেহরি ও ইফতার কেবল মুখের স্বাদ কিংবা পেট ভরানোর ব্যাপার নয়; এগুলো হলো মহান আল্লাহর তরফ থেকে একটি বিশেষ উপহার, একটি সুচিন্তিত পরিকল্পনা, যা আমাদের দেহ ও আত্মাকে একসাথে সাজিয়ে তোলে। আজ আমরা ভেতর থেকে বুঝার চেষ্টা করব, কেন এই দুই বেলার আহারকে নিয়মিত ও সঠিকভাবে পালন করা আমাদের জন্য অপরিহার্য।

Advertisements

সেহরি করার গুরুত্ব: একটি সুন্নতের আড়ালে লুকানো স্বাস্থ্যের রহস্য

শরীরের অভ্যন্তরীণ যন্ত্রকে চালু রাখার প্রথম ধাপ

সেহরির সময়টাকে শুধু খাওয়ার মুহূর্ত হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি আমাদের দেহের জন্য একটি প্রাকৃতিক শক্তি সংরক্ষণের অনুষ্ঠান। সারারাত ঘুমানোর পর আমাদের শরীরের ভেতরের সকল কার্যক্রম একদম ধীরগতিতে চলতে থাকে। সেহরি গ্রহণের মাধ্যমে আমরা সেই নিষ্ক্রিয় শরীরে নতুন করে জীবন সঞ্চার করি।

এটি আমাদেরকে শুধু খাবারই দেয় না, বরং সারাদিনের দীর্ঘ উপবাসের জন্য আমাদের শরীরকে প্রস্তুতও করে তোলে। একজন অভিজ্ঞ পুষ্টিবিদের ভাষায় বলতে গেলে, সেহরি হলো দীর্ঘ একটি যাত্রার আগে গাড়িতে তেল ভরার মতো।

এ সময় যদি আমরা এমন খাবার খাই যা ধীরে ধীরে শক্তি ছাড়ে, যেমন লাল আটার রুটি, ওটস, ডিম বা খেজুর, তাহলে আমাদের রক্তে শর্করার মাত্রা স্থির থাকে। এই স্থিরতা আমাদেরকে ক্ষুধার তীব্র যন্ত্রণা থেকে রক্ষা করে এবং সারাদিন কাজের শক্তি জোগাতে থাকে।

রোজার পুরো দিনটিকে সক্রিয় রাখার রহস্য

যারা সেহরি খান না, তারা প্রায়ই দেখেন যে দিনের মাঝামাঝি সময়ে তারা একদম নিস্তেজ হয়ে পড়েছেন। কাজে মনোযোগ দিতে কষ্ট হয়, শরীর ক্লান্ত লাগে।

এর পেছনে কারণ হলো, সেহরি বাদ দেয়ার অর্থ হলো শরীরকে দীর্ঘ সময়ের জন্য সম্পূর্ণ খাদ্যশূন্য অবস্থায় রাখা। এই অবস্থায় শরীর তার জরুরি শক্তির ভাণ্ডার ব্যবহার করতে বাধ্য হয় এবং স্বাভাবিকের চেয়ে কম শক্তিতে চলতে শুরু করে।

কিন্তু যখন আপনি সেহরি খান, তখন শরীর পর্যাপ্ত পানি ও পুষ্টি পেয়ে এই সংকট মোকাবিলা করতে সক্ষম হয়। এটি আপনার মস্তিষ্ককে সজাগ রাখে এবং আপনার পেশিগুলোকে সক্রিয় রাখে, ফলে আপনি শারীরিক ও মানসিকভাবে সারাদিন ফুরফুরে থাকতে পারেন।

রাসুল (সা.)-এর সুন্নত ও বরকতের দরজা

সেহরি কেবল স্বাস্থ্যের জন্য ভালো তাই নয়, এটি আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত। তিনি নিজে সেহরি করতেন এবং অন্যদেকেও করতে উৎসাহিত করতেন। তিনি বলেছেন, “তোমরা সেহরি খাও, কারণ সেহরিতে রয়েছে বরকত।” এই বরকত শুধু খাবারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়।

এটি আপনার সময়ের মধ্যে বরকত আনে, আপনার শ্রমের মধ্যে বরকত আনে, আপনার সারাদিনের ইবাদতের মধ্যে বরকত আনে। সেহরির সময়টি হলো এমন একটি পবিত্র মুহূর্ত যখন আল্লাহ তার বান্দাদের প্রতি বিশেষ রহমত বর্ষণ করেন। তাই এই সময়ে খাওয়া এবং দোয়া করা এক অপার সৌভাগ্যের বিষয়।

ইফতারের সঠিক নিয়ম: স্বাস্থ্য ও আধ্যাত্মিকতার মিলনস্থল

পানি ও খেজুর দিয়ে শুরু করার বৈজ্ঞানিক ও আধ্যাত্মিক সৌন্দর্য

ইফতারের সময় আজানের ধ্বনি শোনার পর প্রথম যে সুন্নত কাজটি করা হয়, তা হলো পানি ও খেজুর দিয়ে রোজা ভাঙ্গা। এই ছোট অথচ তাৎপর্যপূর্ণ আমলের মধ্যে রয়েছে বিজ্ঞানসম্মত উপকারিতা এবং আধ্যাত্মিক বরকত।

সারাদিন রোজা রাখার কারণে আমাদের পাকস্থলী খালি ও সংবেদনশীল অবস্থায় থাকে। এমন পরিস্থিতিতে হঠাৎ ভারী খাবার গ্রহণ করলে শরীরে অস্বস্তি ও হজমের সমস্যা দেখা দিতে পারে। কিন্তু এক থেকে দুইটি খেজুর এবং অল্প পরিমাণ পানি শরীরকে ধীরে ও স্বাভাবিকভাবে সক্রিয় করে তোলে।

খেজুরে থাকে প্রাকৃতিক চিনি, যা দ্রুত রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা স্বাভাবিক করে। অন্যদিকে পানি শরীরের পানিশূন্যতা দূর করে, ক্লান্তি কমায় এবং দেহকে পুনরুজ্জীবিত করে।

আধ্যাত্মিক দিক থেকেও পানি ও খেজুর দিয়ে ইফতার করা রাসুল (সা.)-এর সুন্নত। তাই এই সহজ পদ্ধতিতে ইফতার করলে আমরা কেবল স্বাস্থ্যকর উপকারই পাই না, বরং সুন্নত পালন করার সওয়াবও অর্জন করি।

ভারী খাবার এড়িয়ে চলার গুরুত্ব

ইফতারের সময় অনেকেরই মনে হয়, “সারাদিন কিছু খাইনি, আজকে যা ইচ্ছে তাই খেয়ে নিই!” এই চিন্তা একদমই ভুল। ইফতারের সময় পেট ভরে না খেয়ে, অল্প করে খেয়ে কিছুক্ষণ পর আবার খাওয়াই হলো স্বাস্থ্যবিজ্ঞানের নিয়ম। একবারে বেশি পরিমাণে ভারী ও তেল-চর্বিযুক্ত খাবার খেলে শরীরের উপর চাপ পড়ে।

তখন আমাদের শরীরের বেশিরভাগ শক্তি চলে যায় সেই খাবার হজম করার কাজে, ফলে আমরা অবসন্ন ও ক্লান্ত বোধ করি। তরকারি, ভাজাপোড়া, মিষ্টিজাতীয় খাবারের বদলে হালকা স্যুপ, ফল, ছোলা-মুরগি এবং পর্যাপ্ত পানি খাওয়া উচিত। এতে শরীরও ভালো থাকে, তারাবির নামাজেও মনোযোগ দেয়া যায়।

সুস্থ জীবনধারায় ইফতারের প্রভাব

রমজান মাস আমাদের জন্য একটি প্রশিক্ষণের মাস। এই মাসে আমরা নিয়মমাফিক জীবনযাপন করতে শিখি। ইফতারের সঠিক নিয়ম মেনে চললে তা আমাদের পুরো জীবনকেই বদলে দিতে পারে। আমরা শিখি ধৈর্য ধরে খাওয়া, পরিমিত খাওয়া এবং স্বাস্থ্যকর খাবার বেছে নেওয়া।

এই অভ্যাসগুলো যদি রমজান পরবর্তী জীবনেও বজায় রাখতে পারি, তাহলে আমরা অনেক দীর্ঘমেয়াদী রোগ যেমন ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ ইত্যাদি থেকে দূরে থাকতে পারব। তাই ইফতার কেবল একটি খাদ্যাভ্যাস নয়, এটি একটি সুস্থ জীবনদর্শনের শিক্ষা দেয়।

রোজা এবং স্বাস্থ্য: কিছু অতিরিক্ত মূল্যবান পরামর্শ

রোজা রাখার সময় শুধু সেহরি-ইফতারই নয়, পুরো দিনের কিছু অভ্যাসেও পরিবর্তন আনা জরুরি।

  • সুষম খাদ্য: সেহরি ও ইফতার দুটোতেই প্রোটিন, শর্করা, স্নেহপদার্থ, ভিটামিন ও মিনারেলের সমন্বয় থাকা চাই। শুধু ভাত-রুটি কিংবা শুধু মাংস-তরকারি নয়, বরং সব ধরনের খাবারই পরিমিত পরিমাণে খাওয়া উচিত।
  • পর্যাপ্ত পানি পান: সেহরির শেষ সময় পর্যন্ত এবং ইফতারের পর থেকে ঘুমানোর আগ পর্যন্ত বেশি বেশি করে পানি পান করতে হবে। চা, কফি, কোমল পানীয় এগুলো শরীর থেকে পানি বের করে দেয়, তাই এগুলো কম খাওয়াই ভালো।
  • হালকা ব্যায়াম: রোজার সময় ভারী ব্যায়াম না করলেও ইফতারের এক-দুই ঘন্টা পরে হালকা হাঁটাহাঁটি বা স্ট্রেচিং করা যেতে পারে। এতে শরীর সক্রিয় থাকে এবং খাবারও ভালোভাবে হজম হয়।

উপসংহার

রমজান মাস হলো আত্মশুদ্ধি ও ইবাদতের মাস। কিন্তু এই ইবাদত সঠিকভাবে পালন করার জন্য আমাদের শরীরটাও তো সুস্থ থাকা দরকার। নিয়মিত ও সঠিক পদ্ধতিতে সেহরি এবং ইফতার পালন করা হলো সেই সুস্থতা নিশ্চিত করার সবচেয়ে বড় উপায়। এটি একদিকে যেমন আমাদের ধর্মীয় কর্তব্য পূরণ করে, অন্যদিকে তেমনি আমাদের দৈহিক স্বাস্থ্যেরও রক্ষাকবচ হয়ে ওঠে।

তাই এই রমজানে প্রতিদিন সেহরি খাওয়া এবং সঠিকভাবে ইফতার করা আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আসুন, আমরা এই ভালো অভ্যাসগুলো গড়ে তুলি এবং রমজানের পূর্ণ সৌন্দর্য ও বরকত লাভ করি।

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)

সেহরি না খেলে রোজা হবে কি?

হ্যাঁ, রোজা হবে। সেহরি খাওয়া রোজার শর্ত নয়, এটি একটি সুন্নত। তবে সেহরি না খেলে রোজার পূর্ণ বরকত ও স্বাস্থ্যগত উপকারিতা থেকে বঞ্চিত হবেন।

ইফতারের সময় প্রথমে কি খাওয়া উচিত?

 ইফতারের সময় প্রথমে এক-দুইটি খেজুর ও এক-দুই গ্লাস পরিষ্কার পানি দিয়ে রোজা ভাঙা উচিত। এটি সুন্নত এবং স্বাস্থ্যের জন্যও উত্তম।

রোজার দিনে কখন ব্যায়াম করা ভালো?

রোজার দিনে ভারী ব্যায়াম না করাই ভালো। ইফতারের এক থেকে দুই ঘন্টা পরে হালকা ব্যায়াম বা হাঁটাহাঁটি করা যেতে পারে।

সেহরিতে কোন ধরনের খাবার এড়িয়ে চলা ভালো?

সেহরিতে অতিরিক্ত নোনতা, মসলাদার ও ভাজাপোড়া খাবার এড়িয়ে চলুন। এগুলো দিনের বেলায় তৃষ্ণা বাড়িয়ে দিতে পারে।

যদি কেউ সেহরির সময় উঠতে না পারে তাহলে কি করবে?

 যদি কেউ সেহরির সময় উঠতে না পারে, তার উচিত রাতেই ঘুমানোর আগে হালকা কিছু খেয়ে নেয়া এবং নিয়ত করে নেয়া। তবে চেষ্টা করা উচিত সেহরি খাওয়ার।

Advertisements
Avatar of Farhat Khan

Farhat Khan

ইসলামী চিন্তাবিদ, গবেষক

আমার সব আর্টিকেল

Your comment will appear immediately after submission.

মন্তব্য করুন