ভারতীয় ইতিহাসে কিছু যুদ্ধ আছে, যেগুলো শুধু একটি রাজ্যের ভাগ্য বদলায়নি—
পুরো দেশের শাসনব্যবস্থার মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে।
বক্সারের যুদ্ধ (Battle of Buxar) ঠিক তেমনই একটি যুদ্ধ।
পলাশীর যুদ্ধের পর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি যে ক্ষমতার পথে হাঁটা শুরু করেছিল,
বক্সারের যুদ্ধ সেই ক্ষমতাকে আইনগত ও স্থায়ী রূপ দেয়।
এই আর্টিকেলে আমরা জানব—
- বক্সারের যুদ্ধ কবে হয়েছিল
- কেন এই যুদ্ধ হয়
- যুদ্ধে কারা অংশ নিয়েছিল
- কীভাবে যুদ্ধটি সংঘটিত হয়
- এবং এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব কী ছিল
সবকিছু সহজ, পরিষ্কার ও ছাত্রবান্ধব ভাষায়।
বক্সারের যুদ্ধ কবে হয়েছিল?
বক্সারের যুদ্ধ হয়েছিল ২২ অক্টোবর ১৭৬৪ খ্রিস্টাব্দে।
এই যুদ্ধটি সংঘটিত হয়েছিল—
- বর্তমান বিহার রাজ্যের বক্সার জেলার কাছে,
- গঙ্গা নদীর তীরে।
এই যুদ্ধ ছিল ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ও ভারতীয় শক্তির মধ্যে
একটি চূড়ান্ত সংঘর্ষ।
বক্সারের যুদ্ধ কেন হয়েছিল? (কারণ)
বক্সারের যুদ্ধ হঠাৎ করে হয়নি।
এর পেছনে ছিল একাধিক গভীর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কারণ।
পলাশীর যুদ্ধের পর কোম্পানির লোভ
১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধের পর—
- ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলার রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ শুরু করে
- নবাবদের ইচ্ছামতো বসানো ও সরানো চলতে থাকে
এতে ভারতীয় শাসকদের মধ্যে অসন্তোষ ও ভয় তৈরি হয়।
মীর কাসিমের সঙ্গে কোম্পানির বিরোধ
মীর কাসিম ছিলেন বাংলার নবাব।
তিনি—
- কোম্পানির বাণিজ্যিক করছাড় বাতিল করেন
- প্রশাসনে সংস্কার আনতে চান
এতে কোম্পানি ক্ষুব্ধ হয়ে
মীর কাসিমকে নবাবের পদ থেকে সরিয়ে দেয়।
ভারতীয় শক্তির ঐক্য
কোম্পানির বিরুদ্ধে একজোট হন—
- বাংলার প্রাক্তন নবাব মীর কাসিম
- অযোধ্যার নবাব শুজাউদ্দৌলা
- মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলম
এই ঐক্যই বক্সারের যুদ্ধের মূল ভিত্তি।
বক্সারের যুদ্ধে কারা কারা অংশ নিয়েছিল?
একদিকে:
- ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি
- সেনাপতি: হেক্টর মুনরো
অন্যদিকে:
- মীর কাসিম
- শুজাউদ্দৌলা
- মুঘল সম্রাট শাহ আলম দ্বিতীয়
এই যুদ্ধ ছিল—
ভারতীয় শক্তির শেষ বড় সম্মিলিত প্রতিরোধ।
বক্সারের যুদ্ধের ঘটনা সংক্ষেপে
১৭৬৪ সালের ২২ অক্টোবর—
- গঙ্গার তীরে দুই পক্ষ মুখোমুখি হয়
- ভারতীয় বাহিনী সংখ্যায় বেশি হলেও
- কোম্পানির সেনাবাহিনী ছিল প্রশিক্ষিত ও সুসংগঠিত
ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি—
- আধুনিক অস্ত্র ব্যবহার করে
- কৌশলগতভাবে যুদ্ধ পরিচালনা করে
ফলাফল হিসেবে—
👉 ভারতীয় জোট বাহিনী পরাজিত হয়।
বক্সারের যুদ্ধের ফলাফল ও প্রভাব
ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির চূড়ান্ত জয়
এই যুদ্ধের পর—
- কোম্পানি ভারতের সবচেয়ে শক্তিশালী রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়
- আর শুধু ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান থাকে না
দেওয়ানি লাভ (১৭৬৫)
বক্সারের যুদ্ধের পর
মুঘল সম্রাট শাহ আলম দ্বিতীয় কোম্পানিকে দেন—
- বাংলা
- বিহার
- উড়িষ্যার দেওয়ানি অধিকার
অর্থাৎ—
👉 রাজস্ব আদায়ের পূর্ণ ক্ষমতা।
ব্রিটিশ শাসনের ভিত্তি স্থাপন
এই যুদ্ধের পর থেকেই—
- ভারতে ব্রিটিশ শাসনের প্রকৃত সূচনা
- প্রশাসন, অর্থনীতি ও সেনাবাহিনী কোম্পানির নিয়ন্ত্রণে চলে যায়
ভারতীয় শাসকদের ক্ষমতা হ্রাস
- নবাব ও সম্রাটরা নামমাত্র শাসকে পরিণত হন
- প্রকৃত ক্ষমতা চলে যায় ব্রিটিশদের হাতে
পলাশীর যুদ্ধ ও বক্সারের যুদ্ধের পার্থক্য
| বিষয় | পলাশীর যুদ্ধ | বক্সারের যুদ্ধ |
|---|---|---|
| সাল | ১৭৫৭ | ১৭৬৪ |
| প্রকৃতি | বিশ্বাসঘাতকতা | সামরিক সংঘর্ষ |
| ফল | রাজনৈতিক প্রভাব | আইনগত ক্ষমতা |
| গুরুত্ব | ক্ষমতার শুরু | ক্ষমতার স্থায়িত্ব |
বক্সারের যুদ্ধ কেন ইতিহাসে এত গুরুত্বপূর্ণ?
কারণ—
- এটি ভারতের স্বাধীন শাসনের শেষ বড় অধ্যায়ের অবসান
- ব্রিটিশরা প্রথমবার আইনগতভাবে শাসক হয়
- পরবর্তী ২০০ বছরের ঔপনিবেশিক শাসনের ভিত্তি তৈরি হয়
উপসংহার
বক্সারের যুদ্ধ ছিল শুধুমাত্র একটি যুদ্ধ নয়—
এটি ছিল ভারতের ইতিহাসের টার্নিং পয়েন্ট।
এই যুদ্ধের পর—
- ভারত ধীরে ধীরে ব্রিটিশ শাসনের অধীনে চলে যায়
- অর্থনীতি, প্রশাসন ও সমাজব্যবস্থা বদলে যেতে শুরু করে
আজও বক্সারের যুদ্ধ আমাদের মনে করিয়ে দেয়—
👉 একটি যুদ্ধ কীভাবে একটি দেশের ভাগ্য বদলে দিতে পারে।
বক্সারের যুদ্ধ সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন
বক্সারের যুদ্ধ কবে হয়েছিল?
২২ অক্টোবর ১৭৬৪ খ্রিস্টাব্দে।
বক্সারের যুদ্ধ কোথায় হয়েছিল?
বিহার রাজ্যের বক্সার জেলার কাছে, গঙ্গা নদীর তীরে।
বক্সারের যুদ্ধে কারা জয়ী হয়?
ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি।
বক্সারের যুদ্ধের সবচেয়ে বড় ফল কী?
কোম্পানি বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার দেওয়ানি লাভ করে।
পলাশীর যুদ্ধ ও বক্সারের যুদ্ধের মধ্যে কোনটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ?
বক্সারের যুদ্ধ, কারণ এটি ব্রিটিশ শাসনকে স্থায়ী ও আইনগত রূপ দেয়।
Your comment will appear immediately after submission.